ছবি সংগৃহীত ।
নিউজ ডেস্কঃ
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী কর্মীকে বা বাংলাদেশি কর্মীকে অপহরণ করে হত্যা এবং দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনার গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নড়ে চড়ে বসেছে। আর এরপরই গ্রেপ্তার হন শামীন মাহফুজ।
প্রকাশ করা আবশ্যক,
বাংলাদেশে সুরক্ষিত মার্কিন দূতাবাসে এমন এক জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেছে ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বলে জানা গেছে।যে কারণে বাংলাদেশের গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে মার্কিন দূতাবাস কোন আস্থা রাখতে পারছে না।
আন্তঃরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করেন এমন অন্তত চারজন ব্যক্তি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিভিন্ন গনমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য উপাত্ত হতে জানা গেছে, ঢাকার বারিধারায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত সুনির্দিষ্ট একটি ধর্ম পালনকারী কর্মীদের এবং এর পাশাপাশি এমনকি বাংলাদেশি কর্মীদের আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আর তার জন্য দূতাবাসের কাছে থাকা একটি মাঠে রেকি করার জন্য ক্রিকেট খেলার সিদ্ধান্ত নেন তারা। গোয়েন্দা তথ্যটির সম্পর্কে ধারণা আছে এমন একজন কর্মকর্তা বলছেন, সেখানে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া এবং এ কিউ আইএসের জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনটিতে কোনো সুনির্দিষ্ট টার্গেটের কথা উল্লেখ না করলেও বলা হয়েছে, তারা নিশ্চিত হয়েছেন প্রাণঘাতী আক্রমণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ওয়াশিংটন ডি সি থেকে আসা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দেখা করে এবং তাদের চরম উদ্বেগের কথা জানায়। তবে কার সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানানো হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত জুন ও জুলাই মাসে মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে দেখা করেন। প্রায় একই সময়ে তার সামরিক অ্যাটাশে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও দেখা করেন তিনি।
তবে শামীন মাহফুজ গ্রেপ্তারের ঘোষণা আসার মাত্র চারদিন আগে, গত ১০ জুলাই দুপুরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর অফিসে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স মেগান বোলডিন (Megan Bouldin) সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সেখানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও সহযোগিতার আহ্বান করেন।
১০ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পরিচালক) ফয়সল হাসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, বৈঠকে দু’দেশের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ইস্যু, সন্ত্রাসবাদ দমন, মামলার প্রসিকিউশন, তরুণীদের অনলাইনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স বলেন, “প্রতিটি দেশই কম-বেশি সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গি হামলার ঝুঁকিতে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক রাজনৈতিক নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদ বলে অভিহিত করা হয়েছিলো। তারপরও বাংলাদেশকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।”’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জবাবে উপদেষ্টা বলেন, “ বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো জঙ্গিবাদ নেই। তবে মাঝেমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল মিটিং-মিছিলের চেষ্টা করে—যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোরভাবে প্রতিহত করছে। শুধু সন্ত্রাসবাদ নয়, যেকোনো ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং তাদেরকে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।”’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ঢাকার বারিধারা ডিপ্লোমেটিক এরিয়ার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিয়মিত নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেখানে কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স বলেন, ‘যেকোন দেশের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে এ সংক্রান্ত এজেন্সিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, সমন্বয় ও তথ্য শেয়ারকরণ অত্যন্ত জরুরি বিষয়। বাংলাদেশের নিয়মিত পুলিশ ফোর্স, গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই, এসবি), সিটিটিসি (কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম), এটিইউ (অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট) প্রভৃতি এজেন্সিগুলোর মধ্যেও একইভাবে পারস্পরিক সংযুক্তি ও তথ্য আদান-প্রদান করা উচিত। তবেই বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও সুসংহত হবে।’
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) খন্দকার মো. মাহাবুবুর রহমান, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক কাউন্সিলর এরিক গ্রীল্যান (Eric Geelan), পলিটিক্যাল মিলিটারি অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোস পোপ (Josh Pope) প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের পরই গ্রেপ্তার হন শামীন মাহফুজ ও তার পরিচয়ঃ
সাভার মডেল থানায় দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হন শামীন মাহফুজ। তিনি আগে জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০১১, ২০১৪ ও ২০২৩ সালেও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
এবার তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার। মামলাটি করেছে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট এটিইউ (অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট)। গত ১৪ জুলাই (সোমবার) নারায়ণগঞ্জ থেকে র্যাব-১১ তাকে গ্রেপ্তার করে এবং পরের দিন আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এই মামলায় আরও ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সাল, ইঞ্জিনিয়ার ইমরান হায়দার, রেজাউল করিম আবরার, আসিফ আদনান, জাকারিয়া মাসুদ ও সানাফ হোসেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা টিটিপির মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জিহাদি কার্যক্রমে অংশ নিতে প্রস্তুত ছিলেন।
ফয়সাল নামে এক ব্যবসায়ী পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে গিয়ে টিটিপির সঙ্গে যুক্ত হন বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে। তার সফরসঙ্গী যুবরাজ নামের এক তরুণ পাকিস্তানের ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযানে নিহত হন।
শামীন মাহফুজ রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। শিক্ষকতা করেছেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ২০১১, ২০১৪ এবং ২০২৩ সালে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার রেকর্ড রয়েছে তার।
এটিইউ জানিয়েছে, শামীন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি না হলেও তার বিরুদ্ধে টিটিপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ রয়েছে। রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
হামলার গোয়েন্দা তথ্যটির বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস বিভাগের এসপি ব্যারিস্টার মাহফুজুল আলম রাসেল কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।
তবে এন্টি টেরোরিজম ইউনিটে কর্মরত একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন। এ বিষয়ে র্যাব-১১ও কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি।
ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র আশা বেহ গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমরা [ বাংলাদেশ] সরকারের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিই।