নিউজ ডেস্কঃ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন কোন দলকে ভোটদানের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দায়িত্বজ্ঞানহীন কেউ যেন আগামীতে ক্ষমতায় না আসে সেজন্য সতর্ক থাকুন।
তিনি ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাবের কথা উল্লেখ করে সবাইকে এই ব্যাপারে পুনরায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এই ঘুর্ণিঝড়ের পর যে দলটির প্রধান বলেছিলেন, ‘যত লোক মারা যাওয়ার কথা ছিল তত লোক মারা যায় নাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আবার ঐরকম কেউ যেন ক্ষমতায় না আসে যে, যত মানুষ মারা যাওয়ার কথা ছিল তত মানুষ মরে নাই বলে দায় দায়িত্বহীনতার পরিচয় কেউ যেন না দেয় ভবিষ্যতে, সেজন্যও দেশবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ দুপুরে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২২’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ৫০টি মুজিব কেল্লা, ৮০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও ২৫টি জেলা ত্রাণ
গুদাম-কাম-দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্য কেন্দ্রেরও উদ্বোধন করেন।
তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
শেখ হাসিনা বলেন, ’৯১ সালে খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায়, তখন দেশে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্নিঝড় হল। সেই ঘূর্নিঝড়ের পর সংসদে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মানুষ মরে নাই। আমি তখন তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আর কত মানুষ মারা গেলে আপনার মনে হবে যে তত মানুষ মারা গেছে?’
তিনি বলেন, ’৯১-এর ওই দূর্যোগে শুধুমাত্র তৎকালীন বিএনপি সরকারের দায়িত্বে অবহেলার কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। দেশের মানুষ যে মরছে সেদিকে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। অথচ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু এবং ঘর-বাড়ি, গবাদি-পশু, ক্ষেতের ফসল এমনকি চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর জাহাজ এবং বিমান বাহিনীর বিমান পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে থাকলেও সে সময় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ত্রাণ নিয়ে ছুটে যায়। পরবর্তীতে সরকারে এসে সেই ঘুর্ণি দুর্গতদের জন্য খুরুশকুল আশ্রয়ন প্রকল্প তৈরী করে তাদের পুনর্বাসনসহ সেই সময় কুতুবদিয়া থেকে ছোট্ট একটি ছেলেকে ঢাকায় এনে পুনর্বাসন করার একটি ঘটনাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন।
মাতা-পিতাসহ সর্বস্ব হারানো সেই ছেলেটিকে ট্রমা সেন্টার থেকে চিকিৎসা করিয়ে নিজের কাছে রেখে দেন এবং এক সময় বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে চাকরি দেন। পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর পর ছেলেটি আনোয়ারায় তার ভাইয়ের পরিবারের সন্ধান পায়।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অনন্য কৃতিত্বের দাবিদার স্বেচ্ছাসেবকদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।
৮৩ জন স্বেচছাসেবককে ১০ হাজার টাকা, সনদ এবং মেডেল প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী ৮৩ জনের মধ্যে নির্বাচিত দু’জন জয়শ্রী রানী দাস এবং মো. জসিম উদ্দিনের হাতে পদক তুলে দেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থানার ওপর একটি ভিডিও চিত্রও অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা কথা মনে রাখতে হবে আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে আমাদের নিজেদের ব্যবস্থাটা (দুর্যোগ মোকাবিলায়) নিজেদেরই করে নিতে হবে। কাজেই উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষায়ণের মাধ্যমে যতবেশি আপনারা একে সবুজে আচ্ছাদিত করতে পারবেন তত বেশি আমরা আমাদের দেশকে বাঁচাতে পারবো।
এই বদ্বীপে আগামীর প্রজন্ম যেন স্ন্দুরভাবে বসবাস করতে পারে সেজন্য তাঁর সরকার শতবর্ষ মেয়াদি ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ প্রণয়ন করেছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, আরো কিছু পরিকল্পনাও আমরা গ্রহণ করেছি অর্থাৎ যেকোন দুর্যোগ থেকে আমাদের দেশটাকে রক্ষার ব্যাপারে আমরা সবসময়ই সচেতন।
তাঁর সরকার নদীর নব্যতা বৃদ্ধিতে নদী ড্রেজিং এবং নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে এবং পুরাতন জলাধার সংস্কারের পাশাপাশি নতুন নতুন জলাধার সৃষ্টিতেও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় সারাদেশকে দুর্যোগের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে একে ৬টি দুর্যোগ হটস্পটে বিভক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, দুর্যোগ ঝুঁঁকি হ্রাস, দুর্যোগের সাড়াদান প্রস্তুতি ও দুর্যোগ পরবর্তী পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা উন্নয়নে ২০২১-২০২৫ সাল মেয়াদের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।
আজকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিশে^ একটি অবস্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যতই দুর্যোগ আসুক আমরা সেটা মোকাবিলায় সক্ষম, আমরা সেটা প্রমাণ করেছি। এটা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্যোগে আমরা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রশমন কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছি। ঘূর্ণিঝড় ব্যবস্থাপনায় সিপিপিসহ আমাদের যেমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে তেমনি বন্যা ও ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আমরা ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা- দশক ২০৩০’ এর কার্যক্রম শুরু করেছি।
শেখ হাসিনা বিএনপি’র অগ্নি সন্ত্রাসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আমাদের বাংলাদেশটা একটা অদ্ভুত দেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন মোকাবেলা করতে হয় আবার অগ্নিসন্ত্রাসের মতো দুর্যোগও আমাদের মোকাবেলা করতে হয়। যেটা মানুষ সৃষ্ট। চলন্ত গাড়িতে আগুন, বাসে আগুন, লঞ্চে আগুন। এটাই হলো আমাদের দুর্ভাগ্য। আর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির ক্ষেত্রে আমাদের কোন ভ’মিকা না থাকলেও আমরা এটার শিকার।
এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তাঁর বলিষ্ঠ ভ’মিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ আমাদের এটাই দাবি ছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এদের সব রকমের সহযোগিতা তাদের দেয়ার কথা।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো আমরা তো অনেক প্রতিশ্রুতি পাই কিন্তু বাস্তবে কতটুকু সহযোগিতা পাওয়া যায়! তারপরও আমি বলবো, প্যারিস চুক্তি হওয়ার ফলে একটা আশার প্রদীপ জ্বলেছে। পাশাপাশি গ্লাসগোতেও কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী ভ’মিকম্প ঝুঁকি প্রশমনে ঘরবাড়ি ও অট্টালিকা নির্মাণে অবশ্যই বিল্ডিং কোড ও আইন মানার এবং এবং অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তথ্যঃ বাসস।
তিনি বলেন, যে কোনো মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগই মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে এবং জাতির পিতার পদাংক অনুসরণ করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আর একদিকে করোনা তারওপর রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এবং স্যাংশন-এসব মোকাবেলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে।