নিউজ ডেস্কঃ
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিএনপি নেতাদের অপপ্রচারের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার কখনো রিজার্ভ থেকে এক পয়সাও নষ্ট করে না, বরং দেশ ও জনগণের স্বার্থে এই টাকা ব্যবহার করে।
তিনি বলেন,‘দআওয়ামী লীগ সরকার এ দেশের এক পয়সাও অপচয় করে না। প্রতিটি অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থেও কল্যাণে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজের উদ্বোধনকালে দেয়া ভাষণে একথা বলেন।
তিনি গণভবন থেকে সাভারের আশুলিয়া বাজার সংলগ্ন কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতারা সব সময় রিজার্ভের টাকা খরচ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, ‘রিজার্ভের টাকা থেকে কোন অর্থ অপব্যবহার হয় না। বিএনপি নেতারা সব সময় বিষয়টি নিয়ে কথা বলে, কারণ তাদের নেতা তারেক রহমানকে মানি লন্ডারিং মামলায় সাত বছরের কারাদন্ড এবং ২০ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তিনি এখন পলাতক আসামী।’
তাদেরকে আমি বলতে চাই বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন রিজার্ভ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়ে এটি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার হয়। সেই জায়গা থেকে আমরা এই রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে সক্ষম হই।
সরকার প্রধান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে যোগাযোগ, যাতায়াত, আমদানী থেকে শুরু করে সবকিছুই প্রায় বন্ধ ছিল। আর যখনই যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্মুক্ত হয়, তখন আমাদের আমদানী করা, পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ^ব্যাপী সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দার জন্য ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থের বাড়তি জোগান ও রিজার্ভ থেকেই দিতে হচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের মত বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন প্রদান এবং করোনা টেষ্টের ব্যবস্থা যেটা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও করতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বক্তব্য রাখেন।
সেতু বিভাগের সচিব মো. মঞ্জুর হোসেন এক্সপ্রেসওয়ে সম্পর্কে পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন।
অনুষ্ঠানে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
আশুলিয়া প্রান্তে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমানসহ সর্বস্তরের মানুষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী পুনরায় উল্লেখ করেন, ‘সকলের জানা উচিত যে, সে একটা সাজাপ্রাপ্ত আসামি। গ্রেনেড হামলা মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানি মামলাতেও সে সাজাপ্রাপ্ত।’
তিনি বলেন, তারা (জিয়া পরিবার) নিজেরা চুরি করে অর্থ সম্পদ বানিয়েছে। কারণ, তাদের তো কিছুই ছিল না। জিয়াউর রহমান যখন মারা যায় তখন আমরা ৪০ দিন টেলিভিশন দেখেছি। ভাঙা স্যুটকেস, আর ছেড়া গেঞ্জি ছাড়া কিচ্ছু রেখে যায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক তারা। জনগণের অর্থ আতœসাৎ করেই এটা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এদেশ স্বাধীন করেছেন। আমরা আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আমাদের একটা দায়বদ্ধতা আছে। কারণ, জাতির পিতা যে আদর্শ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন আমরা সেটাই পূর্ণ করতে চাই। সেই লক্ষ্য নিয়ে রাষ্ট্র চালাচ্ছি বলেই গত ১৩ বছরের মধ্যে এই বাংলাদেশ বদলে গেছে।
বেশিরভাগ উন্নয়ন কাজ নিজেদের অর্থায়নে হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাতে কারও কাছে হাত পেতে চলতে না হয়। নিজেদের সম্মান নিয়ে আমরা নিজেরা চলবো। মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ সম্মানের সঙ্গে চলবে।
তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবেই আমাদের মাথা উঁচু করেই চলতে হবে। একথা সকলকেই মনে রাখতে হবে।
করোনার সময়ও আমাদের অর্থনীতি যাতে শক্তিশালী থাকে, তার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, সেইসঙ্গে সকলের কাছে আহ্বান করেছি, এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে। যেহেতু সারা বিশ্বব্যাপী, করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ স্যাংশন-কাউন্টার স্যাংশনের ফলে প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে গেছে।
দুর্ভিক্ষের ধাক্কা এড়াতে সবাইকে সাবধান থাকার বিষয়ে আহবান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরকে ফসল উৎপাদন করেতে হবে এবং পুষ্টি নিশ্চয়তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের সাবধানতা আমাদেরই নিতে হবে।
তার সরকারের সময়ে সড়কপথ, নৌপথ, আকাশপথের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মেট্টোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করছি। এসবের জন্য টাকা খরচ হচ্ছে। রিজার্ভের টাকা তো লাগবেই, এটাই হলো বাস্তবতা।
প্রধানমন্ত্রী নির্মাণাধীন এলিভেটেড একাসপ্রেসওয়ে প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকা শহরের উত্তরাঞ্চল তথা সাভার, আশুলিয়া নবীনগর, ইপিজেড সংলগ্ন শিল্প এলাকার যানজট নিরসনে এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরিতে তাঁর সরকার ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ’৯৬ সালেই তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন ঢাকা-আশুলিয়া রাস্তা করে দেওয়ার। এখন সেখানে তাঁর সরকার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করে দিচ্ছে। এতে রাস্তাটি যেমন যানজট মুক্ত থাকবে তেমনি যোগাযোগ আরো সহজ হবে। বিশেষকরে শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে ওঠা আশুলিয়ার সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশের যোগাযোগও সহজ হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইপিজেড হয়ে নির্মাণাধীন ২৪ কি.মি. প্রকল্পটিকে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সংশোধিত আকারে ডিপিপি অনুমোদন করে। কাজেই ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি নির্মিত হলে আমাদের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন দ্রুততর হবে।
তিনি বলেন, আর এই প্রকল্পটি ঢাকা ইপিজেড থেকে আশুলিয়া, আব্দুল্লাহপুর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকট ঢাকা কাওলা হয়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত হবার মাধ্যমে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি হয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৪ কি.মি. নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি এটা নির্মিত হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শূন্য দশমিক ২১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায় বলেও জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, এটি এশিয়ান হাইওয়ে অ্যালাইনমেন্টের মধ্যে অবস্থিত একটি প্রকল্প এবং ঢাকা এলিভেডেট এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে ৩০টি জেলার সংযোগ স্থাপনকারি আব্দুল্লাহপুর, আশুলিয়া, বাইপাইল,চন্দ্রা, কুড়িল রোডে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে এবং এক্সপ্রেসওয়েটির সঙ্গে সকল জাতীয় মহাসড়কের যোগাযোগ স্থাপিত হবে। কাজেই তিনি এটি সুষ্ঠুভাবে নির্মাণে নির্মাণ সংশ্লিষ্ট দেশি-বিদেশি সংস্থার সকলের সহযোগিতাও কামনা করেন। বাসস।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সবসময় বিশেষ অবদান রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী এ সময় চীনের রাষ্ট্রপতিকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।