খুলনা মহানগরীর সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম নগরবাসীকে অবহিত করার লক্ষ্যে সিটি মেয়র আলহাজ্ব তালুকদার আব্দুল খালেক নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে কেসিসি মেয়র জানান,
নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য বিগত সময়ে আপনারা
আমার ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের পাশে থেকে সুচিন্তিত পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ
রেখেছেন এবং আপনাদের গঠনমূলক পরামর্শ নাগরিক সেবা সম্প্রসারণে আমাদেরকে সর্বদা উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত
করেছে।
নগর জীবনে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সিটি কর্পোরেশনকে সেবা প্রদান করতে হয়। সেদিকে খেয়াল রেখে
কেসিসি’র বর্তমান পরিষদ যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছে। উন্নয়মূলক কর্মকান্ড বাস্তবায়নের পাশাপাশি সকল সেবা
নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কোভিড দুর্যোগ সবাই মিলে
মোকাবিলা করলেও সাধারণ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় আমরা অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছি। আবার সেই ক্ষতি পুষিয়ে
নিতে দ্বিগুণ উৎসাহে স্বাভাবিক কার্যক্রমে আত্মনিয়োগ করেছি।
আপনারা জানেন, নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১২ জুন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন
অনুষ্ঠিত হবে এবং মেয়র পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বঙ্গবন্ধু
কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন।
তিনি আরও জানান, আসন্ন নির্বাচনের পূর্বে বিগত ৫
বছরে আমাদের কর্মকান্ডের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আপনাদের মাধ্যমে নগরবাসীকে অবহিত করার জন্যই আজকের সাংবাদিক
সম্মেলনের আয়োজন ।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে,
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহের অন্যতম। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে কেসিসি’র স্বাস্থ্য বিভাগের
মাধ্যমে নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আন্তরিকতার সাথে কাজ করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমে কয়েকটি বেসরকারি
সংস্থাও কেসিস্#ি৩৯;কে সহায়তা করছে। নগর স্বাস্থ্য ভবনে প্রতিদিন বিনামূল্যে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সেবা
প্রদানের পাশাপাশি ‘আরবান প্রাইমারী হেলথ কেয়ার’ প্রকল্পের আওতায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মাধ্যমে চিকিৎসা
সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া কেসিসি পরিচালিত নগরীর লাল হাসপাতাল ও তালতলা হাসপাতালে প্রতিদিন গড় হিসেবে
প্রায় ১০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে প্রসূতিদের সিজারিয়ান
অপারেশন ও নরমাল ডেলিভারীর ব্যবস্থা রয়েছে। কুকুর ও অন্যান্য প্রাণী দ্বারা আক্রান্ত হলে সামান্য ফি গ্রহণের মাধ্যমে
প্রতিষেধক ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়। ডায়রিয়া রোগীদের মাঝে বিনামূল্যে স্যালাইন বিতরণ, জাতীয় ভিটামিন-এ
প্লাস ক্যাম্পেইন কার্যক্রমের আওতায় ৬-১১ মাস এবং ১২-৫৯ মাস বয়সী শিশুদেরকে বিনামূল্যে ভিটামিন এ ক্যাপসুল
খাওয়ানো, হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের হামরুবেলা টিকা প্রদান, স্বাস্থ্য
বিষয়ে শিশুদেরকে সচেতন করে তুলতে ক্ষুদে ডাক্তার কর্তৃক শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম, কৃমি নিয়ন্ত্রণ
ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কৃমি নিয়ন্ত্রণ ট্যাবলেট খাওয়ানো ইত্যাদি কার্যক্রম শতভাগ সফলতার
সাথে পরিচালনা করা হচ্ছে। সর্বোপরী সারা বাংলাদেশের ন্যায় করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম আমরাও সফলতার সাথে
চালিয়ে যাচ্ছি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বাস্থ্যকর শহর গড়ে তুলতে বিশ্বের ৫টি শহরকে মনোনীত করা হয়েছে যার
মধ্যে খুলনা একটি। ‘হেলদি সিটি’ প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনাকে একটি আধুনিক, স্মার্ট, সবুজ, স্বাস্থ্যকর শহরে
পরিণত করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।
নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন,
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিটি কর্পোরেশনের সেবামূলক কাজের মধ্যে অন্যতম একটি কাজ যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের সাথে
সম্পৃক্ত। বর্জ্য ব্যাবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তি নির্ভর করার জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩’শ ৯৩
কোটি ৪০ লক্ষ টাকার ‘‘কেসিসি’র বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন এবং
ইতোমধ্যে এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১’শ ৩৮ কোটি টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে। ছাড়কৃত অর্থ দ্বারা প্রয়োজনীয়
ভূমি অধিগ্রহণ ও সেকেন্ডারী ট্রান্সফার স্টেশনের (এসটিএস) নির্মাণ কাজ চলমান আছে। এছাড়া প্রাথমিকভাবে
কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন, রোড সুইপিং মেশিন, লংবুম স্কেভেটর, ১০ চাকার গার্বেজ ট্রাক, পে-লোডার ক্রয়
করা হয়েছে। কম্পাক্টর ট্রাক ও ভাসমান এস্কেভেটর ক্রয়ের জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। যা দ্বারা শহরের ময়লা দ্রুত অপসারণ ও
ময়ূর নদীর পানির প্রবাহ ঠিক রাখার জন্য ভাসমান এস্কেভেটর কাজে লাগানো হবে।
এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে দায়িত্ব গ্রহণের পর, দিনে ০৮ ঘন্টার পরিবর্তে ২ শিফটে ২১
ঘন্টায় উন্নীত করা, দিনের পরিবর্তে রাতে রাস্তা ঝাড়ুর ব্যবস্থা করাসহ ওয়ার্ড পর্যায়ের বিভিন্ন এসটিএস হতে
ট্রাক দ্বারা বর্জ্য রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ডে অপসারণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে কেসিসি কর্তৃক আরো কিছু কার্যক্রম হাতে নেয়া
হয়েছে। যেমন,
১) সিটি রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প-২ (সিআরডিপি-২)-এর আওতায় শলুয়া ল্যান্ডফিলে কম্পোষ্ট সার, ব্যায়োগ্যাস
থেকে বিদ্যুৎ এবং ডিজেল উৎপাদন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।
২) পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় মাথাভাঙ্গা ল্যান্ডফিলে বর্জ্য থেকে কম্পোষ্ট সার ও পলিথিন থেকে ডিজেল উৎপাদন
প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া লবনচরা খালপাড় উন্নয়ন কাজ সমাপ্তির পথে
এবং সোলার পার্কের উন্নয়ন সম্পন্ন হয়েছে।
৩) বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে সাংহাই এস.ইউ.এস. এনভায়রনমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড ও গার্ডিয়ান
নেটওয়ার্ক কর্তৃক দাখিলকৃত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে।
৪) খুলনা সিটি কর্পোরেশনের রাজবাঁধ ট্রেন্সিং গ্রাউন্ড-০২ এ আধুনিক মানব বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন
করা হয়। ঠিকাদারের মাধ্যমে ভ্যাকুট্যাগ দ্বারা মানব বর্জ্য অপসারণ ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে মানব বর্জ্য
থেকে ব্রিকেটস তৈরী করা হচ্ছে যা বাজারজাতকরণের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ করার অনুমতি
প্রদান করা হয়েছে।
সিটি কর্পোরেশনের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক শাখা সম্পর্কে সিটি মেয়র বলেন,
শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক শাখা সিটি কর্পোরেশনের অন্যতম একটি সেবাখাত। শিশুদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের জন্য
এ শাখার মাধ্যমে নগরীতে ৪’শ ৩৬ টি মসজিদ ভিত্তিক মক্তব পরিচালনা করা হয়। ইতোপূর্বে মক্তবের শিক্ষকদের মাসিক ১
হাজার ৭’শ টাকা ভাতা প্রদান করা হতো যা ৫’শ টাকা বৃদ্ধি করে ২ হাজার ২’শ টাকায় উন্নীত করেছি। মক্তব ছাড়াও
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল ও কেসিসি উইমেন্স কলেজ, খালিশপুর
কলেজিয়েট গার্লস স্কুল, ইসলামাবাদ কলেজিয়েট গার্লস স্কুল (ইংরেজি মাধ্যম), নয়াবাটী হাজী শরিয়তউল্লাহ
বিদ্যাপীঠ, কেশব চন্দ্র সাংস্কৃতিক কলেজসহ ৫৬ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় মহানগরীর শিক্ষা বিস্তারে, বিশেষ করে নারী
শিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। ভারত সরকারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত খালিশপুর কলেজিয়েট গার্লস স্কুল’কে
একটি আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলমান আছে।
সুপ্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা-
আপনারা অবগত আছেন যে, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সাথে
সাথে এমনকি মেয়র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা
খুলনা মহানগরীর উন্নয়নে প্রায় ১৫’শ কোটি টাকার ২টি প্রকল্পের অনুমোদন দেন। ‘‘খুলনা সিটি কর্পোরেশনের
গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তা উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয় ৬’শ ৭ কোটি ৫৬ লক্ষ ৭ হাজার টাকা।
মহানগরীর ৫’শ ৭১টি সড়ক উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে ৪’শ ১৮টি সড়কের উন্নয়ন কাজ
সম্পন্ন হয়েছে, চলমান আছে ১’শ ১৪টি এবং টেন্ডারের জন্য অপেক্ষমান আছে ৩৯টি সড়ক।
দ্বিতীয় প্রকল্পটির শিরোনাম হচ্ছে ‘‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন’’ এবং এ প্রকল্পে
ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮’শ ২৩ কোটি ৯৭ লক্ষ ৬ হাজার টাকা। মহানগরীর ২’শ ৬টি ড্রেন উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত
করা হয় যার মধ্যে ৫২টির কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং চলমান আছে ৮৫টি ড্রেনের কাজ। টেন্ডারের জন্য
অপেক্ষমান আছে ৭২টি।
এছাড়া ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় থোক বরাদ্দ হিসেবে
পাওয়া যায় ৪৯ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। উক্ত টাকায় ইতোমধ্যে ৬’শ ৪৭টি প্রকল্পের উন্নয়ন করা হয়েছে এবং অপেক্ষায় আছে
আরো ১’শ ২৪টি প্রকল্প।
বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও কমনওয়েলথ এন্ড ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি)’র
অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতায় খুলনা সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর
জীবনমান উন্নয়ন’’ প্রকল্পের আওতায় বিগত ৫ বছরে ৩৭ কোটি ৭৪ লক্ষ ৭২ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪০ হাজার ৫’শ ৮৭টি
পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে স্বস্থ্য ও পুষ্টি, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা প্রদানসহ দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ
দেয়া হয়েছে। এছাড়া নি¤œআয়ের বসতি এলাকায় ৪৯.১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের (৮ ফুটের কম প্রশস্তের) প্রায় ১ হাজার
৩’শটি সড়কসহ ড্রেন ও ১২টি কমিউনিটি ল্যাট্রিন এবং ১ হাজার ৫’শ ৪টি পারিবারিক ল্যাট্রিন নির্মাণ করা
হয়েছে।
ব্রাক-আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের মধ্য থেকে ৬৮টি পরিবারের জন্য আবাসন
ব্যবস্থাসহ শহিদ হাদিস পার্কে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।
জার্মান কোঅপারেশনের (জিআইজেড) অর্থায়নে ১’শ ১৪টি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের আর্থ-সামাজিক অবস্থার
উন্নয়নে ৬’শ ৪৩ টি ছাগল বিতরণসহ ছাগল পালনের অবকাঠামোগত সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া পেশাগত
দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকার ও জার্মান সরকারের (কেএফডব্লিউ) যৌথ অর্থায়নে ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতি মোকাবেলায় খুলনা
শহরের উন্নয়ন (ফেজ-২)’’ শীর্ষক ৪’শ ৯১ কোটি ২৮ লক্ষ ৬১ হাজার টাকার একটি প্রকল্প চলতি ২০২৩ সালের
জানুয়ারিতে একনেক সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নগরীর দৌলতপুর ও মহেশ্বরপাশায় শহর রক্ষা বাঁধ;
রূপসায় রিভার ফ্রন্ট পার্ক; দেয়ানা চৌধুরী খাল খনন ও পাড় বাধাইসহ নবীনগর, বাস্তুহারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকার
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ড্রেন উন্নয়ন, আলুতলা স্লুইচ গেট আধুনিকায়ন, নিরালা খাল খনন, পাড় বাধাই ও উভয় পার্শ্বে
ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ নগরীর জনগুরুত্বপূর্ণ ২৩টি পুকুরের উন্নয়ন করা হবে।
এছাড়া নেদারল্যান্ডস সরকারের সহযোগিতায় ‘‘ওয়াটার এজ লেভারেজ, ন্যাচারাল ড্রেনেজ সলুশন ফর খুলনা সিটি’’
শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় জলাবদ্ধতা নিরসনে ময়ূর, খুদে ও শোলমারী নদীসহ সংযুক্ত খালসমূহ সংরক্ষণ, স্লুইচ গেট ও পাম্প
হাউজ নির্মাণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থায়নে নগর বনায়ন
কর্মসূচি; ইউএস-এইড এর অর্থায়নে ‘‘এশিয়া রিজিলিয়েন্ট সিটিস’’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় টেকসই নগর
উন্নয়নে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যাতায়াত ইত্যাদি খাতে অর্থায়ন এবং জার্মান সরকারের অর্থায়নে
বেসরকারি সংস্থা কারিতাস-এর মাধ্যমে নগরীতে ‘‘স্ট্রেনদেনিং রিজিলাইন্ট লাইফ এন্ড লাইভলিহুড ফর ক্লাইমেট
মাইগ্রেন্টস ইন আরবান স্লামস অব কেসিসি’’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় লিংক রোড নির্মাণ, পানির উৎস মেরামত,
স্যানিটেশন ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুরের আবাসন সংস্কারসহ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহারের
কার্যক্রম চলমান আছে।
উল্লেখ করা আবশ্যক যে, বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ সংক্রমণের কারণে সমগ্র বিশ্বের ন্যায় দেশের সকল কার্যক্রম স্থবির
হয়ে পড়ে যা প্রায় ০৩ বছর স্থায়ী ছিল। সে কারণে ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও যথাসময়ে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা সম্ভব
হয়নি। ফলে নগরবাসীকে হয়তো কিছুটা কিছু দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত এবং অনাকাঙ্খিত এ
বিলম্বের জন্য আপনাদের মাধ্যমে নগরবাসীর নিকট দু:খ প্রকাশ করছি। তবে চলমান উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত হলে খুলনা
আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত একটি স্বাস্থ্যকর নগরীতে পরিণত হবে ইনশাআল্লাহ।
সম্মানিত সাংবাদিক বন্ধুগণ-
খুলনা আমাদের প্রিয় নগরী। ম্যানগ্রোভ খ্যাত সুন্দরবনসহ মোংলা সমুদ্র বন্দর ও ইপিজেড এবং ভোমরা ও বেনাপোল স্থল
বন্দর পরিবেষ্টিত এ বিভাগীয় শহরের গুরুত্ব এখন অনেক। সর্বোপরী পদ্মা সেতু এ অঞ্চলের গুরুত্ব অনেকখানি বাড়িয়ে
দিয়েছে। এ সকল বিষয়কে সামনে রেখে পরিকল্পিত উন্নয়ন করা সম্ভব হলে এতদাঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার
আমূল পরিবর্তন ঘটবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
নগরীর উন্নয়ন সম্পর্কে তিনি জানান,
এক সময়ের শিল্প নগরী খ্যাত খুলনার উন্নয়নই আমার মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য পূরণে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি
কর্পোরেশন নির্বাচনে নগরবাসীর নিরঙ্কুশ সমর্থনে আমি মেয়র নির্বাচিত হই। সে সময়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী
খুলনার উন্নয়নে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ দেন। কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচনে আমি মেয়র নির্বাচিত না
হওয়ায় নগরবাসী সেই অর্থের সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। এবারও চলমান উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুণরায় আমাকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন প্রদান করেছেন। উল্লেখ করা
প্রয়োজন যে, বিদ্যমান প্রকল্পের পাশাপাশি আরো ১৫’শ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা
হয়েছে। চলমান কাজের সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাপ্তিসহ প্রেরণকৃত প্রকল্পটির অনুমোদন সাপেক্ষে সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য
আসন্ন মেয়র নির্বাচনে আপনাদের মাধ্যমে নগরবাসীর সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থন আশা করছি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ-
খুলনা সিটি কর্পোরেশন একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও এখানের সকল উন্নয়ন কাজ সরকারের বরাদ্দের ওপর
নির্ভরশীল। সে কারণে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য অর্থাৎ, কেসিসি’র নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন কাজ
বাস্তবায়নে উদ্যোগী হওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বার-বার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দু:খজনক হলেও এ কথা সত্যি যে,
বিগত ২০০৮-২০১৩ ও ২০১৮-২০২৩ উভয় মেয়াদে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল ঋণের ভারে
জর্জরিত। দৈনন্দিন অফিস ব্যয় নির্বাহের পর অর্থাভাবে সময়মত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও
সম্ভব হত না। সে কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পাশাপাশি পৌরকরের হার বৃদ্ধি না করে এ প্রতিষ্ঠানটিকে
অর্থনেতিকভাবে স্ববলম্বী করার কাজেও মনোনিবেশ করতে হয়।
আপনারা জনেন কেসিসি’র রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে পৌরকর এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে পৌরকর ধার্যের সাধারণ
একটি হিসাব হচ্ছে বছরের ২ মাসের ভাড়ার সমপরিমাণ অর্থ। কিন্তু আমরা তা না করে যতটা সম্ভব ছাড় দিয়ে বর্ধিত
অংশের পৌরকর ধার্য করেছি। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা জরুরী যে, পৌরকর পরিশোধের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নগরবাসীর দুর্ভোগ
লাঘবে ২০০৮-২০১৩ মেয়াদে ব্যাংকের মাধ্যমে পৌরকর পরিশোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করি এবং চলতি মেয়াদে তা সময়ের
প্রয়োজনে অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বর্তমানে আমাদের ওয়েবসাইট থেকে বাংলাদেশে প্রচলিত সকল
ধরণের অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করা যাচ্ছে। অচিরেই ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নসহ
জনসম্পৃক্ত অন্যান্য বিষয়গুলিও অনলাইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলমান আছে। মোবাইল ফোন থেকে সকল লেনদেন করার
সুবিধার্থে একটি অ্যাপস তৈরীর কাজও চলমান আছে।
প্রিয় উপস্থিতি-
খুলনা শহরের সৌন্দর্য বর্ধণের জন্য নগরীর গুরুত্বপুর্ণ ২২ টি মোড় চিহ্নিত করা হয়েছে যার কাজ শীঘ্রই শুরু হবে।
শহরের মধ্যে সকল জলাধার/পুকুরকে সংরক্ষণের জন্য প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে এবং চলতি অর্থবছরেই এর কাজ শুরু হবে।
হাইটেক পার্কের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। পার্কটি উম্মুক্ত হলে দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠার পাশাপাশি বেকার সমস্যারও
সমাধান হবে। নগরবাসীর মাঝে স্বাস্থ্যকর মাংস সরবরাহের লক্ষ্যে একটি আধুনিক কসাইখানা নির্মাণের জন্য রাজবাঁধে
ইতোমধ্যে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কসাইখানাটি
নির্মাণের লক্ষ্যে শীঘ্রই টেন্ডার আহবান করা হবে।
মেয়র নগরীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে জানান,
নগরবাসীকে অবহিত করার লক্ষ্যে আমাদের কয়েকটি ভবিষ্যত পরিকল্পনা: তুলে ধরছি-
১। জলাবদ্ধতা নিরসনে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ নগরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মাটির নিচের পানি সংরক্ষণে
প্রাকৃতিক নদী, খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ করা হবে।
২। নগরবাসীর চিত্তবিনোদন ও পরিবেশ রক্ষায় পার্ক এবং উম্মুক্ত স্থানে খেলার মাঠ নির্মাণ।
৩। নগরীতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১টি করে সেকেন্ডারী ট্রান্সফার স্টেশন
(এসটিএস) নির্মাণ। আশার কথা হচ্ছে ইতিমধ্যে কেসিসি ও কুয়েট কর্তৃক গৃহীত এসসিআইপি
প্লাস্টিক প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি মাস্টারপ্লান প্রণয়নের কাজ চলমান আছে।
৪। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসহ শিক্ষা, পুষ্টি ও ব্যবসা
সহায়তা এবং স্যানিটেশন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম ভবিষ্যতেও চলমান রাখা।
৫। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে সিটি সেন্টার, ওয়ার্ড অফিস কাম কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ, কলেজিয়েট স্কুল, বাজার
নির্মাণসহ কেসিসি’র বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে ও পুকুরে সোলার প্যানেল স্থাপন।
৬। দূষিত পানি রিসাইক্লিং-এর মাধ্যমে পুনব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বৃষ্টির পানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে
নগরভিত্তিক টেকসই পানিচক্র প্রকল্প বাস্তবায়ন।
৭। এডিবি’র অর্থায়নে নগরীর সকল স্টেকহোল্ডারদের সমন্বয়ে একটি সিটি ডেভেলপমেন্ট প্লান প্রস্তুত করা হবে। ফলে
নগরীর সকল উন্নয়নমূলক কাজ সমন্বের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
৮। কোরিয়ান সরকারের আর্থিক সহায়তায় খুলনা স্মার্ট সিটি ব্যাসিক প্লান প্রস্তুত করা হবে যা স্মার্ট শহর
বিনির্মাণে ভূমকা রাখবে।
সিটি মেয়র সাংবাদিকদের আরও জানান,
আমরা মনে করি খুলনা নগর ভবন নগরবাসীর আশা-আকাঙ্খার প্রতীক। নগরীর প্রতিটি মানুষের আশা-আকাঙ্খা, উন্নয়ন,
প্রাপ্তি-প্রত্যাশা, আনন্দ-বেদনা, জন্ম-মৃত্যু সকল বিষয়ে নগর ভবন এবং নগরবাসীর মধ্যে রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক।
আমাদের প্রত্যাশা আগামীতে নগরবাসীর সাথে নগরভবনের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠতর হবে এবং আমরাও সেই লক্ষ্য নিয়ে
কাজ করে যাবো ইনশাআল্লাহ। খবরঃ বিজ্ঞপ্তির