লালনের দর্শন মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য দৃষ্টান্তঃ সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’-বাউলসম্রাট লালন শাহের এই চিরন্ত দর্শনকে ধারণ করে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় গতকাল শনিবার শুরু হয়েছে লালনমেলা ও আলোচনা অনুষ্ঠান। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে লালন একাডেমি চত্বরে আয়োজিত এ মেলা চলবে আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। আজ বিকেলে উদ্বোধন ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবারের লালনমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক এবং লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন-হাসান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী লালন সাধক ও ভক্তদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, লালন সাধকেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালন দর্শন ও সাধনাকে ধারণ করে আসছেন। লালনের দর্শন আমাদের মানবতা, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়।

তিনি বলেন, বিগত শাসনামলে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার পথ রুদ্ধ করার ফলে সমাজে একটি অন্ধকার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। তরুণ সমাজ মাদকাসক্তিসহ নানা সামাজিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। মন্ত্রী বলেন, বিগত দুই দশকের শাসনামলকে জনগণের কাছে একটি ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গুম, খুন, নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান দেশের মানুষকে নতুন আশার পথ দেখিয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে সেই অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন ও আলোকিত বাংলাদেশের সূচনা করতে চায়। এ নতুন বাংলাদেশ হবে জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও সৃজনশীলতার বাংলাদেশ একটি নবজাগরণের বাংলাদেশ।

নিতাই রায় চৌধুরী কুষ্টিয়ায় ‘লালন নগরী’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, লালনের স্মৃতি ও দর্শনকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলকে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। তিনি গড়াই-মধুমতী নদীতে নৌকাবাইচসহ দেশীয় খেলাধুলা, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে উৎসাহিত করতে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

গেস্ট অব অনারের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডাঃ জাহেদ উর রহমান বলেন, লালন শাহ শুধু বাংলাদেশের নন; তাঁর দর্শন বিশ্বমানবতার সম্পদ। বর্তমান বিশ্বে বিভাজন, সংঘাত ও অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে লালনের মানবতাবাদী দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি লালনগীতির সংরক্ষণ, স্বরলিপি প্রণয়ন ও বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, লালন শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নন; শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের কাছে লালনের দর্শন ও সৃষ্টিকে পৌঁছে দিতে হবে। উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে মধ্যপন্থী, উদার ও মানবিক বাংলাদেশের কথা বলেন, তার প্রতিফলন লালন ও কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিতে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। এই দর্শনকে সামনে রেখে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় লালন ও নজরুলের সাহিত্য-সংগীত-দর্শনকে দেশ-বিদেশে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি।‘লালন শাহের তিরোধান ও তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার’ শীর্ষক আলোচনায় মুখ্য আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ড. রশিদুন্নবী।

উদ্বোধনী দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল লালনসংগীতের আসর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীদের কণ্ঠে লালনের গান উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা।

লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত এ মেলা আগামী ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত লালন একাডেমি চত্বরে চলবে।