-কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।
খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থেকে জয়বাংলা মোড় পর্যন্ত এই সড়কটি, যা সোনাডাঙ্গা বাইপাস নামে পরিচিত, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। এই ২.১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে, যা খুলনাকে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, ঢাকা, বরিশালসহ প্রায় ১৮টি জেলার সঙ্গে সংযুক্ত করে। কিন্তু দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই সড়কটি খানাখন্দে ভরা, ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে, যা যাত্রী, চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ২০১১ সালে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এই সড়ক নির্মাণ করে ২০১৩ সালে সম্পন্ন করে, কিন্তু তারপর থেকে সড়কটির অংশবিশেষ খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর হাতে হস্তান্তরিত হয়। এর ফলে দায়িত্বের সমন্বয়হীনতা এবং জমি-সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, যা স্থায়ী সংস্কার কাজকে বছরের পর বছর আটকে রেখেছে।
সড়কের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ। ময়ূর নদীর পূর্ব পারের অংশ কেসিসির দায়িত্বে, যখন পশ্চিম পার এলজিইডির অধীনে। সোনাডাঙ্গা মডেল থানার সামনে থেকে ময়ুর ব্রিজ পর্যন্ত ৭৮০ মিটার অংশ জমি জটিলতার কারণে প্রশস্তকরণ কাজ আটকে আছে, যা সড়কটিকে আরও সংকীর্ণ এবং বিপজ্জনক করে তুলেছে। বর্ষাকালে পানি জমে যাওয়ায় সড়কটি জলমগ্ন হয়ে যায়, যা যানবাহনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি এবং রিপোর্ট অনুসারে, সড়কটি খানাখন্দে ভরা এবং অবৈধ দখলের কারণে চলাচল অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কেসিসি কিছু অংশে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে, যেমন নভেম্বর ২০২৫-এ যৌথ অভিযান, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এখনও শুরু হয়নি। স্থানীয়ভাবে ইট-বালু দিয়ে জোড়াতালি দেওয়া হলেও, তা স্থায়ী সমাধান নয় এবং বারবার ভেঙে যায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে নগরীর প্রবেশপথগুলোতে এই ধরনের দুর্ভোগ নিয়েই বছর শেষ হচ্ছে, যা খুলনাবাসীর জন্য একটি চিরকালীন সমস্যা।
এই সড়কের খারাপ অবস্থা শুধু যোগাযোগের সমস্যা সৃষ্টি করেনি, বরং নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। খানাখন্দের কারণে প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে; বাস, ট্রাক, অটোরিকশা এবং সাইকেল চালকরা গর্তে পড়ে আহত হচ্ছেন। স্থানীয় চালকরা জানিয়েছেন যে এই সড়কটি “মরণফাঁদ” এর মতো, যেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি সর্বদা উপস্থিত। এছাড়া, সড়কের ধুলোবালি এবং নির্মাণ সামগ্রীর অনিয়ন্ত্রিত ছড়ানো ছিটানো খুলনা শহরের বায়ু দূষণকে বাড়িয়ে তুলেছে। ধুলোকণার কারণে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগ বেড়েছে, বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের মধ্যে। বর্ষায় সময় জমা পানি মশা এবং অন্যান্য কীটপতঙ্গের প্রজনন কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। খুলনা শহরের সামগ্রিক ধুলাদূষণ সমস্যা এই সড়কের অবস্থা দিয়ে আরও তীব্র হয়েছে, যা নগরবাসীর স্বাস্থ্যকে মুমূর্ষু করে তুলেছে।
সমস্যার মূল কারণ হলো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। কেডিএ, কেসিসি এবং এলজিইডির মধ্যে দায়িত্বের টানাপোড়েন এবং জমি জটিলতা সংস্কার কাজকে স্থবির করে রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালে সড়ক হস্তান্তরের পরও ২০২১-২০২২ সালে এলজিইডি কিছু অংশ সংস্কার করলেও, পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প এখনও অনিশ্চিত। এই সমন্বয়হীনতা খুলনা শহরের অন্যান্য প্রবেশপথ যেমন রূপসা ব্রিজ থেকে শিপইয়ার্ড অথবা মোস্তফার মোড় থেকে রায়েরমহল সড়কেও দেখা যায়, যা সামগ্রিকভাবে নগরীর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং যাত্রীরা বারবার অভিযোগ করেছেন যে এই দুর্ভোগের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে, যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে এবং সময় নষ্ট হচ্ছে।
এই সড়কের দ্রুত উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থা, কেডিএ, কেসিসি, এলজিইডি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগকে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জমি জটিলতা নিরসনে যৌথ কমিটি গঠন, বাজেট বরাদ্দ এবং সময়বদ্ধ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া দরকার যাতে দায়িত্বের বিভাজন স্পষ্ট হয় এবং কোনো অংশই অবহেলিত না থাকে। স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, নিরাপত্তা বাড়াতে সড়কের পাশে লাইটিং, সাইনবোর্ড এবং স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা দরকার, যখন স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে ধুলো নিয়ন্ত্রণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। খুলনা একটি শিল্প-বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নশীল, তাই এই সড়কের সংস্কার না হলে সামগ্রিক অর্থনীতি প্রভাবিত হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা দিয়ে এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, যা খুলনাবাসীর জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখবে। সকলের সহযোগিতায় এই সড়ককে একটি নিরাপদ এবং সুন্দর যোগাযোগপথে রূপান্তরিত করার সময় এসেছে।