কর্নেল জামিল ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের একজন পরীক্ষিত সামরিক সচিব 

ফাইল ছবি।

ঘটনার বিশদ বিবরণঃ

কর্নেল জামিল ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। তিনি ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সামরিক সচিব ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু র জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায় এগিয়ে যাওয়া পাকিস্তান হতে ফেরত একজন সেনা অফিসার- কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।

১৫ আগষ্ট ভোরবেলা,‌ ১৯৭৫; গণভবনের সরকারী কোয়ার্টারে ঘুমন্ত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সামরিক সচিব কর্নেল জামিল। দিনটি তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন, এদিন তার ডিজিএফআই এর প্রধানের দায়িত্ব নেবার কথা। বঙ্গবন্ধুও সকাল বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে যাবার কথা। তার নিরাপত্তা নিয়ে গতদিন কেটেছে তার খুবই ব্যস্ত। বংগবন্ধুর ৩২ নং এর বাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে কখনোই জামিল সন্তুষ্ট নন, এ নিয়ে প্রায়ই আক্ষেপ করতেন যে বঙ্গবন্ধু কেন যে গণভবনের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে থাকতে চান না। আবার নিজেই বলতেন যে তাতে কি, বঙ্গবন্ধুকে গুলি করতে হলে আগে আমাকে গুলি করতে হবে। কথাটি ফলে গেছিল খুবই করুন ভাবে।

ভোর ৫টার দিকে জামিলের বাড়ির ফোন বেজে উঠল। জামিলের স্ত্রী আঞ্জুমান আরা জামিল ফোন ধরলেন; অপর প্রান্তে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জলদ গম্ভীর কন্ঠ; জামিলকে চাচ্ছেন। মিসেস জামিল জামিলকে ফোন দিলেন। মিসেস জামিল অপর প্রান্তের কথা শুনলেন না, জামিলকে শুধু বলতে শুনলেন, আমি এখনই আসছি স্যার। জামিল ফোন রেখে স্ত্রীকে বললেন যে কারা যেন বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমন করেছে। তার জীবন বিপন্ন, আমাকে এখনই যেতে হবে। ড্রাইভার আইনুদ্দিনকে দ্রুত তৈরী হতে নির্দেশ দিলেন, নিজেও সিভিল পোষাকে তৈরী হওয়া শুরু করলেন। এরই ফাঁকে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহকেও ফোন করে ফোর্স পাঠাতে বললেন, রক্ষীবাহিনী সদর দফতরেও ফোন করলেন। সিভিল পোষাকে প্রস্তুত হলেও তার গুলি ভর্তি সার্ভিস রিভলবারও নিলেন। বাবা মায়ের নীচু শব্দের কথাবার্তায় পাশের ঘর থেকে বড় মেয়ে কংকাও ঘুম ভেঙ্গে ঘরে ঢুকেছে। সে শুধু দেখল তার বাবা তৈরী হয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলেন। বেরিয়ে যাবার আগে আরেকবার নিজেই বংগবনধুর বাড়িতে ফোন করলেন, তবে সেখানে কেউ ফোন ধরছে না।

পরের ঘটনা জানা যায় ড্রাইভার আইনুদ্দিন ও সোবহানবাগ মসজিদের ইমামের ভাষ্য থেকে। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাছে সোবহানবাগ মসজিদের কাছে পৌছে আর তারা এগুতে পারছেন না। সেখানে ঘাতক দলের একটি বাহিনী রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রেখেছে। জামিল গাড়ি থেকে নেমে ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে গেলেন। দায়িত্বে আছে এক সুবেদার মেজর। তাকে জামিল নিজের পরিচয় দিয়ে নির্দেশ দিলেন ব্যারিকেড সরাতে এবং তার সাথে বাহিনী নিয়ে এগুতে। সুবেদার মেজর একটু দ্বিধায় পড়ে গেল।

বজলুল হুদা এসে সুবেদার মেজরের কাছে জানতে চায়, গাড়িতে কে? কর্নেল জামিল, স্যার; জবাব আসে। ড্রাইভার আইনুদ্দিনের ভাষ্যমতে বজলুল হুদা জামিলের নাম শোনা মাত্র সুবেদার মেজরকে গুলি করার নির্দেশ দেয়। ভ্যাবাচ্যাকা সুবেদার মেজর এ নির্দেশ পালনে অস্বীকৃত জানায়, না আমি পারব না। এর ফলে বজলুল হুদা নিজেই ষ্টেনগান হাতে এগিয়ে এল, বিনা বাক্য ব্যায়ে গাড়িতে বসা জামিলকে লক্ষ্য করে এক ঝাঁক গুলি ছুড়ে দিল, তিনবার লা ইলাহা পড়তে পড়তে পরপারে পাড়ি দিলেন জামিল, রেখে গেলেন কর্তব্যবোধ ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বলে রাখা ভাল যে জামিল সেখানে পৌছাবার আগেই বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে পাইকারি হত্যাকান্ড শেষ হয়ে গেছিল। ড্রাইভার আইনুদ্দিন প্রান ভয়ে কোনমতে পালিয়ে গেল। পুরো ঘটনার একমাত্র সিভিলিয়ান স্বাক্ষী হয়ে রইলেন সোবহানবাগ মসজিদের ইমাম সাহেব। হত্যাকান্ডের পর সৈন্যরা জামিলের লাশ সহ গাড়ি ঠেলে ঠেলে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়ে যায়, বাড়ির পেছনের আঙ্গিনায় ফেলে রাখে লাশ সমেত গাড়ি। কোন কোন সূত্রমতে জামিলকে ভয় দেখানো হয়েছিল গুলি করা হবে বলে। জামিল পরোয়া করেননি, দৃপ্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, চালাও গুলি।